মোঃ অহিদুল্লাহ্ সোনারগাঁ প্রতিনিধি,
একসময় সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রধান মাধ্যম ছিল ছাপা পত্রিকা। এরপর এলো রেডিও, তারপর টেলিভিশন। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল সাংবাদিকতা, ভিডিও কনটেন্ট, লাইভ সম্প্রচার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদ পরিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে সাংবাদিকতার ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে একজন সাংবাদিকের কাজের পদ্ধতি, দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা এবং পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল।
কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের যুগেও সাংবাদিক সমাজের একটি অংশ এখনো অনলাইন সাংবাদিকতাকে ছোট করে দেখেন। অনেক সময় নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছোড়া হয়—‘সে আবার কিসের সাংবাদিক? সে তো অনলাইন সাংবাদিক!’ এমন মন্তব্য শুধু একজন সাংবাদিককে হেয় করার চেষ্টা নয়; এর মধ্য দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা হয়।
প্রশ্ন হলো—সাংবাদিকতার মর্যাদা কি মাধ্যম দিয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি সাংবাদিকের কাজ দিয়ে?
বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যম ছিল না। সাংবাদিকতার মূল শক্তি হচ্ছে সত্য অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, মানুষের কথা তুলে ধরা, জনস্বার্থের বিষয় সামনে আনা এবং দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ পরিবেশন করা। সংবাদটি ছাপা কাগজে প্রকাশ হলো, টেলিভিশনে প্রচার হলো, নাকি অনলাইনে প্রকাশ হলো—এটি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম; সাংবাদিকতার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
প্রযুক্তির সঙ্গে সাংবাদিকতার সম্পর্ক নতুন নয়
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকতাও বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার সংবাদপত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। রেডিও সংবাদকে দ্রুত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। টেলিভিশন সংবাদকে শব্দের পাশাপাশি ছবি ও সরাসরি সম্প্রচারের শক্তি দিয়েছে। আর ইন্টারনেট সংবাদকে করেছে আরও দ্রুত, বহুমাত্রিক এবং সহজলভ্য।
সুতরাং অনলাইন সাংবাদিকতার উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সাংবাদিকতার ধারাবাহিক বিবর্তনেরই অংশ।
বর্তমানে একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং প্রাথমিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ করতে পারেন, সাক্ষাৎকার নিতে পারেন, তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। একই সঙ্গে সেই প্রতিবেদনে ছবি, ভিডিও, মানচিত্র, নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট তথ্য যুক্ত করা সম্ভব।
এই পরিবর্তন সাংবাদিকতার পরিধিকে সংকুচিত করেনি; বরং আরও বিস্তৃত করেছে।
‘অনলাইন সাংবাদিক’ বলে খাটো করার প্রবণতা কেন অযৌক্তিক?
একজন সাংবাদিক অনলাইনে কাজ করেন বলেই তার সাংবাদিকতা কম গুরুত্বপূর্ণ—এমন ধারণার কোনো পেশাগত ভিত্তি নেই। বরং অনলাইন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেক সময় তাৎক্ষণিকতার পাশাপাশি দ্রুত তথ্য যাচাই, ছবি-ভিডিও যাচাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ এবং পাঠকের প্রতিক্রিয়া সামলানোর মতো অতিরিক্ত দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
আজকের একজন অনলাইন সাংবাদিককে শুধু লিখতে জানলেই হয় না। তাকে মোবাইল ক্যামেরা পরিচালনা, ভিডিও ধারণ ও সম্পাদনা, অডিও রেকর্ডিং, লাইভ সম্প্রচার, ছবি সম্পাদনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা, অনলাইন তথ্য অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন ডিজিটাল উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যাচাইয়ের মতো কাজও জানতে হয়।
অর্থাৎ প্রযুক্তি সাংবাদিকের কাজকে সহজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকের দক্ষতার পরিধিও বাড়িয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বদলেছে, কিন্তু সাংবাদিকতার দায়িত্ব বদলায়নি
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি—অনলাইন সাংবাদিকতা মানেই যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো তথ্য প্রকাশ করা নয়। বরং ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার দায়িত্ব আরও বেশি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। ছবিটি কোথাকার, কখনকার, ভিডিওটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য কী, তথ্যটির নির্ভরযোগ্য উৎস কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাজ।
একইভাবে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিযোগিতায় দ্রুত সংবাদ প্রকাশের চাপ থাকলেও ভুল তথ্য প্রকাশ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ একটি ভুল তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
তাই আধুনিক সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হচ্ছে তথ্য যাচাই বা fact-checking। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ভুল তথ্য শনাক্ত করা, পুরোনো ছবি দিয়ে নতুন ঘটনার বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাই করা এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নিশ্চিত করা এখন সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরোনো অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় প্রয়োজন
এখানে প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতাকে ছোট করারও কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা সাংবাদিকদের সংবাদবোধ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা, সূত্র ব্যবস্থাপনা এবং ঘটনা বিশ্লেষণের দক্ষতা নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুরোনো ও নতুনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাদের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোই হতে পারে সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক যদি মাঠের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্ত করেন, তাহলে তার কাজ আরও শক্তিশালী হতে পারে। আবার একজন তরুণ অনলাইন সাংবাদিক যদি প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রবীণ সাংবাদিকদের কাছ থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা গ্রহণ করেন, তাহলে তার পেশাগত সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
‘আমি জানি’ নয়, ‘আমি শিখছি’—এই মানসিকতা জরুরি
প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে সফটওয়্যার, ক্যামেরা বা প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয়, কয়েক বছর পর সেটি হয়তো আর থাকবে না। নতুন নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, মোবাইল জার্নালিজম এবং ডিজিটাল অনুসন্ধানী পদ্ধতি সাংবাদিকতার কাজে যুক্ত হচ্ছে।
তাই একজন সাংবাদিকের শেখার প্রক্রিয়া কখনো শেষ হওয়ার কথা নয়।
যিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন, তার অভিজ্ঞতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নতুন প্রযুক্তি শেখার আগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে একজন তরুণ সাংবাদিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হলেও তাকে সাংবাদিকতার নৈতিকতা, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
কারণ প্রযুক্তি একজন সাংবাদিককে দ্রুততর করতে পারে, কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিবেক ও সাংবাদিকতার নৈতিকতা প্রযুক্তি তৈরি করে দিতে পারে না।
পরিবর্তনকে প্রতিহত নয়, গ্রহণ করতে হবে
সময়কে থামিয়ে রাখা যায় না। প্রযুক্তির অগ্রগতিও থামানো সম্ভব নয়। আজ যে অনলাইন মাধ্যমকে কেউ তুচ্ছ মনে করছেন, সেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই হয়তো লাখো মানুষ প্রতিদিন সংবাদ পড়ছেন, দেখছেন এবং মতামত দিচ্ছেন।
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কোন মাধ্যমে থাকবে—এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: সংবাদ পৌঁছানোর মাধ্যম যতই পরিবর্তিত হোক, সত্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন মানুষের সবসময় থাকবে।
তাই ‘সে তো অনলাইন সাংবাদিক’ বলে কাউকে হেয় করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—সে কী ধরনের সংবাদ করছে? তার তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য? সে কতটা অনুসন্ধানী? সে কি মানুষের কথা তুলে ধরছে? তার প্রতিবেদনে জনস্বার্থ কতটা রক্ষা পাচ্ছে?
একজন সাংবাদিকের পরিচয় তার প্ল্যাটফর্ম নয়; তার পরিচয় তার কাজ।
সুতরাং সময়ের পরিবর্তনকে কটাক্ষ না করে, প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে এবং নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের হেয় না করে নিজেদের আরও দক্ষ করে তোলাই এখন সময়ের দাবি। পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব হয়ে উঠবে।
আধুনিকতাকে কটাক্ষ করে কেউ সময়কে পেছনে ফেরাতে পারে না। বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আপডেট করাই প্রকৃত পেশাদারিত্বের পরিচয়।
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ ‘প্রিন্ট বনাম অনলাইন’ নয়; সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ হলো সত্য, দক্ষতা, প্রযুক্তি, নৈতিকতা এবং মানুষের আস্থার সমন্বিত পথচলা।